ড. হাফিজুর রহমান
প্রাথমিক ও শিক্ষাজীবন
ড. হাফিজুর রহমানের জন্ম গাজীপুর জেলার কালনী গ্রামে। পড়ালেখার হাতেখড়ি কালনী ইসলামিয়া ফাজিল (বিএ) মাদরাসায়, যেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে (উপজেলা পরিষদ) বৃত্তি লাভের পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় পুরো প্রতিষ্ঠানে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপরের দেশের পড়াশোনার প্রায় পুরো সময়টাই কাটিয়েছেন টঙ্গীতে। তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী থেকে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করার পাশাপাশি তা’মীরুল মিল্লাত থেকে ফাজিল ও কামিলও সম্পন্ন করেন। ২০১৪ সালে তুরস্ক সরকারের স্কলারশিপে মনোনীত হয়ে গাজী বিশ্ববিদ্যালয়ে (আঙ্কারা) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য তুরস্কে যান এবং ২০২০ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
তিনি ২০২১ সালে তুরস্কের তোকাত গাজি ওসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং বর্তমানে অধ্যাপনায় নিয়োজিত আছেন। পাশাপাশি ২০২৫ সালের জুলাই মাস থেকে সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস-এ ভিজিটিং স্কলার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পেশায় একাডেমিশিয়ান ও গবেষক হলেও লেখালেখি তার শখ। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে নিয়ে বাংলায় লেখা প্রথম বই “এরদোয়ান: দ্য চেঞ্জ মেকার”, আমার দেখা তুরস্ক এবং ইসলামী রাজনীতি তত্ত্বে রাষ্ট্র ধারণা — এই তিনটি বই-ই বেস্টসেলার তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর বাইরে বিশ্বখ্যাত জার্নালগুলোতে তার লেখা পিয়ার-রিভিউড আর্টিকেল, বুক চাপ্টার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কনফারেন্সে অংশ নিয়েছেন।
ছাত্র রাজনীতি ও সাংগঠনিক দায়িত্বপালন
খুব ছোটবেলাতেই তিনি ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। ইউনিট ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ক্রমান্বয়ে তা’মীরুল মিল্লাত, টঙ্গী শাখার সভাপতি এবং টঙ্গী অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় তুরস্কে পিএইচডি স্কলারশিপে মনোনীত হন। তুরস্কে যাওয়ার পর তিনি সেখানের সংগঠন বাংলাদেশ ফোরাম অব তুর্কি’র প্রথমে সেক্রেটারি জেনারেল (২০১৫–২০২১) এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সভাপতি (২০২১–অদ্যাবধি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিভাগসহ বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজপথে আন্দোলন ও জুলাই বিপ্লবে ভূমিকা : ড. হাফিজুর রহমান ২০০৯-১৪ সময়কালে টঙ্গী ও ঢাকার রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারই অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে কারাবরণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে প্রবাসীদের সংগঠিতকরণ, অনলাইন এক্টিভিজম এবং কুটনৈতিক নানা তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সামাজিক কাজ
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদের নানা সমস্যা সমাধান ও সামাজিক কাজে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তা’মীরুল মিল্লাত, টঙ্গীর জিএস এবং ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিন আল ইত্তিহাদ ফাউন্ডেশন ও লেন্ডিং লাইব্রেরীর উদ্যোগ নিয়েছিলেন যার মাধ্যমে এখনো প্রতিবছর তা’মীরুল মিল্লাতে ভর্তি হওয়া আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ছাত্ররা বিনামূল্যে বইসহ নানা বৃত্তি পেয়ে থাকে।
গাজীপুরে রেনেসাঁ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান (২০১২–২০১৪) হিসেবে গরিব-দুঃস্থদের আর্থিক সহায়তা ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। ঢাকাস্থ গাজীপুর জেলার ছাত্রদের নিয়ে গাজীপুর স্টুডেন্টস ফোরাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তুরস্কে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নৈতিক বিকাশ এবং বিশেষত ছাত্রদের নানা সমস্যায় সহায়তা করার লক্ষ্যে তিনি তার সহকর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা
তার এই সামাজিক কর্মকাণ্ড শুধু বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও নানা কার্যক্রমে যুক্ত। তিনি ২০১৬–২০২১ সালে তুরস্কের অন্যতম সিভিল সোসাইটি নিউ ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন-এর আন্তর্জাতিক ছাত্রদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে প্রায় ৫০টি দেশের ছাত্রদের সংগঠিত করা, তাদের ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও নৈতিক বিকাশে কাজ করেছেন। পাশাপাশি তুরস্ক সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তুরস্কের ২০২৩ সালের মর্মান্তিক ভূমিকম্পে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন এবং ত্রাণ বিতরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ নানা দেশের বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিয়েছেন এবং নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
নানাবিধ উদ্যোগ
তিনি নানাবিধ প্রতিষ্ঠান দাড় করেছেন এবং এগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইস্তানবুলে সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ (CPSR) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে এর চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। তুরস্কে বাংলাদেশি শিশুদের বাংলা ও ইসলামী শিক্ষা প্রসারের জন্য বাংলাদেশ অনলাইন স্কুল তুর্কিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০২৩ সাল থেকে এর ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশী ছাত্রদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে নানা প্লাটফর্ম (ক্যারিয়ার ওয়ার্ল্ড, দারুল হিকমাহ ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এর মাধ্যমে গত দশ বছরে পুরোপুরি বিনামূল্যে কয়েকশত শিক্ষার্থী পিএইচডি, মাস্টার্স ও অনার্স পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। তিনি তা’মীরুল মিল্লাত, টঙ্গী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়াও তিনি নানা সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিশু সংগঠন, পাঠাগার, ব্লাড ডোনেশন ক্লাব ও একাডেমিক নানা ক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্টপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন